ভিডিও করি টিভিত দেখে কি লাভ, হামার খোঁজ কেউ নেয়না- সুন্দরগঞ্জে বানভাসিদের আহাজারি

Tista Tista

Express

প্রকাশিত: ৪:০০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২০

মাসুম লুমেনঃ

সাতদিন আগেও রান্না-বান্না আর সংসার চলছিলো নিজ ঘরেই, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! বর্তমানে সে ঘরবাড়ি এখন নদী গর্ভে বিলীন। চারিদিকে পানি আর পানি। পুরোনো স্মৃতির সুখেদুখে রাত কাটানো সেই আপন ঘর এখন সর্বনাশা তিস্তার করাল গ্রাসে পানির অতল গহবরে হারিয়ে গেছে চোখের সামনেই। অবাক আর অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ে দেখা ছাড়া যেন আর কোনো উপায় নেই।

“একমাস ধরি এ পর্যন্ত ৫ বার ঘর সড়িয়ে এখন আশ্রয় নিচি অন্যের বাড়িত, সেটাও ভাঙ্গবের নাগচে। কয়েকদিন আগে দামি দামি ১৫টা গাছ কাটপের ধরি কাটপের দিলনা; কয় আর ভাঙ্গবের নয়, এখন ঘরবাড়ি সগি বানোত ভাসি গ্যাঁচে, ভিডিও করি টিভিত দেখে কি লাভ? হামার খোঁজ কেউ নেয়না। খালি শুনি চেয়ারম্যান আসপে, এমপি আসপে, হামার ঘর ভাঙ্গা বন্ধ করি দিবে… কিন্তু সেই দিতে দিতে হামার সগি ভাসি গেল,এখন আর মরা ছাড়া কোনো উপায় নাই! আল্লাহ ছাড়া হামার কেউ নাই। অনেকটা ক্ষোভ এবং হতাশার সুরে কথা গুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের শেষ সীমানা কাশিমবাজার গ্রামের কয়েকজন বয়স্ক নারী।

সরেজমিনে দেখা যায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার এলাকায় গত দুই মাসে তিস্তা নদীর ভাঙনে চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। চরম হুমকিতে আছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ বি-এল উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ দাখিল মাদরাসা ও ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কাশিমবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এখন নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার মুখে। যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর ধরে তিস্তা নদীর ভাঙনে এইসব নিঃস্ব মানুষগুলো ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি ও আবাদি জমি হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এমন জীবন যুদ্ধে নিদারুণ কষ্টে দিনানিপাত করলেও কেউ আসেনি একটু খোঁজ নিতে। বারবার নদী ভাঙ্গা বন্ধ করার আশ্বাস দিলেও তা কখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে বানভাসি মানুষের মনের ভিতর ক্ষোভের পাহাড় জমে উঠেছে।

হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার গ্রামের বাসিন্দা রঞ্জু, মাইদুল ইসলামসহ স্থানীয়রা জানান, উনি ( এমপি) বললেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ভাঙবেনা। কিন্তু বিল্ডিং গেল, মসজিদ গেল, ঘরবাড়ি, জমি সব ভেঙ্গে গেল, কিন্তু এখনো তাদের কোন খোঁজ নেই?

আমরা অনেক কষ্টে আছি। গত নির্বাচনে আমাদের নাজিরাবাদ স্কুলমাঠে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কথাই তিনি রাখেননি। নির্বাচনের পর থেকে তার আর কোন খোঁজ নাই।


কান্না জড়িত কন্ঠে উপজেলার ১১ নং হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজারের সর্বস্ব হারানো রওশন আরা বেগম বলেন, বাপ ছোট রেখে মারা যান অনেক আগেই। ’ ভিটে ছাড়া সহায় সম্বল বলতে কিছুই ছিলো না, তাই রাস্তায় কাজ করে সন্তানের মুখে খাবারের ব্যবস্থা করেছি, কিন্তু সর্বনাশা তিস্তা মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে।

স্থানীয় ব্যক্তি আব্দুস ছাত্তার জানান, দুই চরের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণে ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি কখনও কাশিমবাজারে আসেন না। আমি যে মেম্বার, আমাকে যে জনগণ ভোট দিয়েছে তাদের সেবা করার জন্য এই কথা চেয়ারম্যান বুঝতে চান না। তিনি এই এলাকায় কখনও আসেন না। চেয়ারম্যান না চাইলে আমি কীভাবে জনগণের পাশে দাঁড়াবো।

হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করছি।আর কিছু সীমাবদ্ধতার কারনে সবার দিকে দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব হয়না।

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম সরকার লাবু মুঠোফোনে বার বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তিস্তা নদীর কাশিমবাজার পয়েন্টে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, গাইবান্ধার মানচিত্রে হরিপুরের কাশিমবাজার থাকলেও গাইবান্ধা থেকে ওই এলাকা অনেক দূরে। ওই এলাকার নদী ভাঙ্গা দেখাশোনার দায়িত্ব কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের। এ বিষয়ে আমার কিছুই করার নেই।