আহম্মদ উদ্দিন শাহ্ শিশু নিকেতন- মাজহারউল মান্নান

Tista Tista

Express

প্রকাশিত: ১০:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২০

পর্ব–১

আমি কারমাইকেল থেকে রিটায়ার করি ১৯৯৯-এর নবেম্বরে আর এখানে জয়েন করি ২০০০-এর জানুয়ারির শুরুতে। তখনও এই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটার নামের সাথে স্কুল কথাটা লাগেনি। কলেজ তো আরও পরে।


প্রথম দিন স্কুলে গিয়েই পড়লাম অস্বস্তিতে। দীর্ঘ দিন বড় বড় কলেজে অনার্স মাস্টার্স পড়িয়েছি। হঠাৎ ছন্দপতন ঘটিয়ে স্কুলের বাচ্চাকাচ্চাদের পড়াতে হবে, কেমন যেন হীনমন্যতায় ভুগতে লাগলাম।


এক সময় ভাবলাম, ফিরে যাই। দরকার নেই এরকম একটা অস্বস্তিকর কাজের।


আমার মনের অবস্থা দেখে প্রিন্সিপাল স্যার বললেন, কী করবে, ক্লাসে যাবে? আজ না হয় থাক।


দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললাম, না যাই, কোন ক্লাসে যাবো? ক্লাস টেনেই যাও। ওটাই তো হাইয়েস্ট ক্লাস। টেস্ট করে দেখ, ভালো না লাগলে ফিরে আসো। তোমাকে এই কাজ করতেই হবে, এমন তো নয়। সরলভাবে কথাগুলো বললেন স্যার।

 

আমি কিন্তু আর ফিরতে পারলাম না। আটকা পড়ে গেলাম। আটকা পড়ে গেলাম আমার খুব প্রিয় জায়গা শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে। লক্ষ করলাম ক্লাসগুলোতে অনেক ঝক ঝকে মেধাবী মুখ। পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ, শিক্ষকের কথা শোনার আগ্রহ, প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য প্রতিযোগিতা, সুন্দর হাতের লেখা, পরিচ্ছন্ন পোশাকপাতি, বইখাতা, সব মিলিয়ে মনে হলো চমৎকার। আমি কোন এক যাদু মন্ত্রে বশীভূত হয়ে গেলাম।

চাকরি জীবনের শেষ দিকে পড়ালেখার অভ্যাস প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। এই সব মেধাবী ছেলেমেয়ের সংস্পর্শে এসে আবার নতুন করে আমার বই-খাতা খুলে বসতে হলো।

প্রতি দিন পড়াশুনা করে যাই। ক্লাসে গিয়ে ওদের বন্ধু সাজি। নিজেকে নামিয়ে আনি ওদের স্তরে। ক্লাসের পড়া, সাহিত্যের গল্প, ইতিহাসের গল্প, জীবনের গল্প, আগামী দিনের স্বপ্নের গল্প, সব মিলিয়ে আনন্দময় ক্লাসগুলো কোন দিক দিয়ে পার হয়ে যায় টেরই পাই না। ঘণ্টা পড়লে চমকে উঠি। নীরবতা ভেঙে ছেলেমেয়েরাও কলরব করে ওঠে। এক ক্লাস থেকে বেরোতে না বেরোতেই আর এক ক্লাসের ছেলেমেয়েরা এসে দরোজায় দাঁড়িয়ে থাকে ।

ক্লাস সেভেন থেকে টেন পর্যন্ত ডেইলি চার পাঁচটা ক্লাস নেই। কোনো ক্লান্তিই বোধ করি না। বয়সের বোঝা যেন ক্রমেই কমে আসতে লাগলো। কোনো দিন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কোনো ক্যাজুয়াল ক্লাসে গেলে তারা আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না। আমি ক্লাস থেকে বেরোনোর পরপরই ওরা গিয়ে হাজির হয় প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে। ভিপি স্যারের একটা পার্মানেন্ট ক্লাস তাদের চাই।

কোনো কোনো দিন প্রিন্সিপাল স্যার আমার ক্লাসের পাশ দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ান। একটুখানি দেখেন তারপর মুচকি হেসে চলে যান সামনের দিকে।

এ সময় একদিন একটা অন্য রকম ঘটনা ঘটলো। একটা ক্লাস শেষে যাচ্ছিলাম আমার চেম্বারের দিকে। স্টাফ রুমের পাশ দিয়ে যেতে হয়। প্রিন্সিপাল স্যার শিক্ষকদের উদ্দেশে কী যেন বলছিলেন। সহসা শুনতে পেলাম, স্যার বলছেন, কীভাবে ক্লাস নিতে হয় দেখে আসো ভাইস প্রিন্সিপালের ক্লাসে। বুঝতে পারবে না, লেখাপড়া শেখাচ্ছে না ম্যাজিক দেখাচ্ছে।

আমার গুরু, যার পায়ের কাছে বসে আজীবন শিখলাম, সেই রমজান স্যারের মুখে এমন কথা শুনে মনে হলো অনেক পাওয়া হয়ে গেছে আমার। আমি আর কিচ্ছু চাই না।

আহম্মদ উদ্দিন শাহ্ শিশু নিকেতন/ পর্ব–২

কারমাইকেল থেকে রিটায়ার করার পর আমি যখন এই স্কুলে জয়েন করি তখন উত্তরের নতুন বিল্ডিংটার দোতালা উঠছে সবে। ছোটদের অনেকগুলো ক্লাস আর অফিস তখনও নিচে টিনের দোচালায়। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও খুব বেশি নয়। এই অবস্থায় আমি গিয়ে সাথী হিসেবে পেলাম অসাধারণ কয়জন প্রবীণ শিক্ষক। এঁদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন সরকারি বেসরকারি হাই স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক।
ওসমান গনি সাহেব পড়াতেন ইংরেজি। বাংলা ইংরেজি উভয় বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা ছিলো তাঁর। ওসমান গণি সাহেবের বিশুদ্ধ ইংরেজি শেখানোর কৌশলের কথা আজও ভুলতে পারেনি সেই সময়ের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা। আমার থেকে অনেক সিনিয়র ছিলেন তিনি। কিন্তু এক দিনের জন্য আমাকে স্যার ছাড়া সম্বোধন করেননি। সামাদ বিএসসি সাহেব এবং সতীর্থ বন্ধু আব্দুল হামিদ পড়াতেন অংক আর বিজ্ঞান। দু’জনই শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন সমান প্রিয়। ছিলেন কাশেম বিএসসি। তিনি ছিলেন আমার এক কালের ছাত্র। অংক তার কাছে ছিলো ছেলের হাতের মোয়া। আর একজন ছিলেন রউফ সাহেব। তিনি পড়াতেন ইংরেজি। কথা বলতেন কম। কিন্তু ক্লাস নিতেন খুব নিষ্ঠার সাথে। এখানে পড়াতে এসে নিজেই অনেক শিখেছি এই গুণী মানুষদের কাছে। শুধু আবদুল হামিদ ছাড়া এঁদের কেউ আর বেঁচে নেই। দেশবিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো কৃতজ্ঞ ছাত্রছাত্রী আজও চোখের পানি ফেলে তাঁদের এসব প্রিয় শিক্ষকের কথা স্মরণ করে।

এই প্রতিষ্ঠানে এসে আরও কয়জন অসাধারণ শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়েছিলো আমার। এঁরা হলেন কিউ এল বেগম সাজেদা, সুলতানা বেগম, রিজিয়া সুলতানা খুকু। সব ক’জনই ছিলেন সাদা মনের মানুষ।
সদাহাস্য সাজেদা ম্যাডামকে আমি বলতাম কুইন লায়লা ওয়া লায়লা। আমার সম্বোধন শুনে তিনি হাসিতে বিগলিত হয়ে পড়তেন।
সুলতানা ম্যাডাম প্রতি পৌষ মাসে পিঠা খাওয়াতেন সবাইকে। হরেক রকম পিঠা।
খুকু আপা নাকি ছাত্রী ছিলেন আমার। বয়সের তুলনায় বুড়িয়ে গিয়েছিলেন একটু বেশি। এমন সাদা সরল ভালো মানুষ আমি দেখিনি এর আগে। থ্রি ফোরে বাংলা পড়াতেন।
একদিনের কথা বলি। কোনো একটা ক্লাস পরীক্ষার বাংলা রচনায় দশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর দিয়েছিলেন পাঁচ। আমার কাছে নালিশ নিয়ে এলো বাচ্চাটা। খুকু আপাকে ডাকলাম। বললাম, আপা, বাচ্চাটা তো ঠিক ঠিক উত্তর দিয়েছে। একে তো কমপক্ষে আট দিতে পারতেন। তিনি বিস্ময়ে হাত কপালে ঠেকালেন, বলেন কি স্যার, বাংলায় অ্যাতো নম্বর! কিছু হাতে রাখা লাগবে না? বললাম, হাতে রেখে কী করবেন? তিনি ঢোক গিলে এদিক ওদিক তাকালেন। তারপর নিজে নিজে বললেন, তাই তো, হাতে রেখে কী করবো? বলেই হেসে ফেললেন। সরল নির্মল সে হাসি।

আর দুই জন অসাধারণ মানুষের কথা বলেই এ পর্ব শেষ করবো। এরা হলেন ময়না আর মিনতি। দুই জনই আয়া। শিশুদের এত প্রিয় মানুষ এই চত্বরে কেউ ছিলো বলে মনে হয় না। এরা দুইজন আসতো সেই পুলবন্দী থেকে। কিন্তু একদিনও দেরিতে এসেছে বলে মনে পড়ে না। দুজনই ছিলো ধর্ম অন্তঃপ্রাণ। আমি একবার কলকাতা গিয়ে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ভিডিও করে এনেছিলাম। তাই দেখে দুজনের কি কান্না। আমার সামনে গড় হয়ে প্রণাম করে বলে, স্যার, আপনি খুব ভালো মানুষ, ভগবান আপনাকে অনেক পুণ্যি দেবে। দুজনই অনেকদিন হলো অবসরে গেছে । বিদায়ের দিন শুধু কেঁদেই কাটিয়েছে ওরা। এখনও মাঝে মধ্যেই স্কুলে এসে বসে থাকে। জিজ্ঞেস করলে চোখ মোছে আর বলে, মনটা যে এখানেই পড়ে থাকে স্যার।

বিশ বছর কাজ করার পর কয়দিন আগে আমি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি এই প্রতিষ্ঠান। ছেড়ে দেয়ার পর থেকে দিনমান শয়নে স্বপনে এক মুহূর্তের তরে মাথা থেকে নামাতে পারিনি এই বিদ্যায়তনের কথা। আমি এখন বুঝতে পারি কেন ময়না মিনতি ফিরে ফিরে আসে এখানে। জিজ্ঞেস করলে কেন দু’চোখ পানিতে পূর্ণ হয়ে আসে ওদের।

কারমাইকেল থেকে রিটায়ার করার পর আমি যখন এই স্কুলে জয়েন করি তখন উত্তরের নতুন বিল্ডিংটার দোতালা উঠছে সবে। ছোটদের অনেকগুলো ক্লাস আর অফিস তখনও নিচে টিনের দোচালায়। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও খুব বেশি নয়। এই অবস্থায় আমি গিয়ে সাথী হিসেবে পেলাম অসাধারণ কয়জন প্রবীণ শিক্ষক। এঁদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন সরকারি বেসরকারি হাই স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক।

ওসমান গনি সাহেব পড়াতেন ইংরেজি। বাংলা ইংরেজি উভয় বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা ছিলো তাঁর। ওসমান গণি সাহেবের বিশুদ্ধ ইংরেজি শেখানোর কৌশলের কথা আজও ভুলতে পারেনি সেই সময়ের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা। আমার থেকে অনেক সিনিয়র ছিলেন তিনি। কিন্তু এক দিনের জন্য আমাকে স্যার ছাড়া সম্বোধন করেননি। সামাদ বিএসসি সাহেব এবং সতীর্থ বন্ধু আব্দুল হামিদ পড়াতেন অংক আর বিজ্ঞান। দু’জনই শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন সমান প্রিয়। ছিলেন কাশেম বিএসসি। তিনি ছিলেন আমার এক কালের ছাত্র। অংক তার কাছে ছিলো ছেলের হাতের মোয়া। আর একজন ছিলেন রউফ সাহেব। তিনি পড়াতেন ইংরেজি। কথা বলতেন কম। কিন্তু ক্লাস নিতেন খুব নিষ্ঠার সাথে। এখানে পড়াতে এসে নিজেই অনেক শিখেছি এই গুণী মানুষদের কাছে। শুধু আবদুল হামিদ ছাড়া এঁদের কেউ আর বেঁচে নেই। দেশবিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো কৃতজ্ঞ ছাত্রছাত্রী আজও চোখের পানি ফেলে তাঁদের এসব প্রিয় শিক্ষকের কথা স্মরণ করে।

এই প্রতিষ্ঠানে এসে আরও কয়জন অসাধারণ শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়েছিলো আমার। এঁরা হলেন কিউ এল বেগম সাজেদা, সুলতানা বেগম, রিজিয়া সুলতানা খুকু। সব ক’জনই ছিলেন সাদা মনের মানুষ।

সদাহাস্য সাজেদা ম্যাডামকে আমি বলতাম কুইন লায়লা ওয়া লায়লা। আমার সম্বোধন শুনে তিনি হাসিতে বিগলিত হয়ে পড়তেন।

সুলতানা ম্যাডাম প্রতি পৌষ মাসে পিঠা খাওয়াতেন সবাইকে। হরেক রকম পিঠা।

খুকু আপা নাকি ছাত্রী ছিলেন আমার। বয়সের তুলনায় বুড়িয়ে গিয়েছিলেন একটু বেশি। এমন সাদা সরল ভালো মানুষ আমি দেখিনি এর আগে। থ্রি ফোরে বাংলা পড়াতেন।

একদিনের কথা বলি। কোনো একটা ক্লাস পরীক্ষার বাংলা রচনায় দশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর দিয়েছিলেন পাঁচ। আমার কাছে নালিশ নিয়ে এলো বাচ্চাটা। খুকু আপাকে ডাকলাম। বললাম, আপা, বাচ্চাটা তো ঠিক ঠিক উত্তর দিয়েছে। একে তো কমপক্ষে আট দিতে পারতেন। তিনি বিস্ময়ে হাত কপালে ঠেকালেন, বলেন কি স্যার, বাংলায় অ্যাতো নম্বর! কিছু হাতে রাখা লাগবে না? বললাম, হাতে রেখে কী করবেন? তিনি ঢোক গিলে এদিক ওদিক তাকালেন। তারপর নিজে নিজে বললেন, তাই তো, হাতে রেখে কী করবো? বলেই হেসে ফেললেন। সরল নির্মল সে হাসি।

আর দুই জন অসাধারণ মানুষের কথা বলেই এ পর্ব শেষ করবো। এরা হলেন ময়না আর মিনতি। দুই জনই আয়া। শিশুদের এত প্রিয় মানুষ এই চত্বরে কেউ ছিলো বলে মনে হয় না। এরা দুইজন আসতো সেই পুলবন্দী থেকে। কিন্তু একদিনও দেরিতে এসেছে বলে মনে পড়ে না। দুজনই ছিলো ধর্ম অন্তঃপ্রাণ। আমি একবার কলকাতা গিয়ে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ভিডিও করে এনেছিলাম। তাই দেখে দুজনের কি কান্না। আমার সামনে গড় হয়ে প্রণাম করে বলে, স্যার, আপনি খুব ভালো মানুষ, ভগবান আপনাকে অনেক পুণ্যি দেবে। দুজনই অনেকদিন হলো অবসরে গেছে । বিদায়ের দিন শুধু কেঁদেই কাটিয়েছে ওরা। এখনও মাঝে মধ্যেই স্কুলে এসে বসে থাকে। জিজ্ঞেস করলে চোখ মোছে আর বলে, মনটা যে এখানেই পড়ে থাকে স্যার।

বিশ বছর কাজ করার পর কয়দিন আগে আমি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি এই প্রতিষ্ঠান। ছেড়ে দেয়ার পর থেকে দিনমান শয়নে স্বপনে এক মুহূর্তের তরে মাথা থেকে নামাতে পারিনি এই বিদ্যায়তনের কথা। আমি এখন বুঝতে পারি কেন ময়না মিনতি ফিরে ফিরে আসে এখানে। জিজ্ঞেস করলে কেন দু’চোখ পানিতে পূর্ণ হয়ে আসে ওদের।

(ফেজবুক টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত)