আহম্মদ উদ্দিন শাহ্ শিশু নিকেতন-মাজহারউল মান্নান

Tista Tista

Express

প্রকাশিত: ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২০

আহম্মদ উদ্দিন শাহ শিশু নিকেতনে প্রথম এসে যেসব মেধাবী মুখ আমি শ্রেণি কক্ষে দেখেছি তাদের সবার কথা আজ আর সঠিক স্মরণ নেই। এই অক্ষমতা প্রতিনিয়ত পোড়ায় আমাকে। সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ফেসবুকের কল্যাণে কারো কারো সাথে হঠাৎ-মটাৎ যোগাযোগ হয়ে যায়।

২০০০ সালের ক্লাস টেনের মেধাবী ছাত্র রাগিব হাসান আরেফিন মন্টি শুনেছি বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে সস্ত্রীক গিয়েছিলো স্টেটসে। ইঞ্জিনিয়ার স্ত্রীসহ এখন স্থায়ীভাবে বাস করছে সেখানে। সারা আলম নামের মেয়েটি শুনেছি ডাক্তার হয়েছে। ডাক্তার স্বামীর সাথে থাকে ঢাকায়। তুষার-লেনিনও হয়েছে ডাক্তার। মিষ্টি মেয়ে সিঁথি’র সকন্যা ছবি দেখি ফেসবুকে। সে এখন গর্বিত জননী। মা ডাকে মুগ্ধ।

পরের বার ক্লাস টেনে উঠলো জান্নাতুর নুর রিশাদ আর সোহরাব আলম সোমেল। যদ্দুর মনে পড়ে ওদের সাথে ছিলো মোশতাক, চমন, রাসু, ইকো, লোপা, পান্না, দীপ। ফার্স্ট হওয়া নিয়ে রিশাদ আর সোমেল দুই বন্ধুতে সে কি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ! শুনেছি, রিশাদ লন্ডন থেকে পড়াশুনা করে এসে হাল ধরেছে বেসরকারি সংস্থা জিউকে’র। মাঝেমধ্যে তার সস্ত্রীক ছবি দেখি ফেসবুকে। সোমেল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে শিক্ষকতা করতো ঢাকার কোন এক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে। শুনেছি সে নাকি পিএচডি করতে গেছে অস্ট্রেলিয়ায়। এখন শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল দেখে আর নাকি চেনার উপায় নেই সেই ঝাঁকড়া বাবরি চুলের সোহরাবকে। মোশতাক ডাক্তার হয়ছে জানি, কে একজন বললো, লোপা, পান্না, দীপ এরাও হয়েছে ডাক্তার।

এদের পরের ক্লাসে ছিলো ফুয়াদ হোসেন আনন্দ, শিমুলি, বিপাশা, নির্ঝর, উজান, তারিক, তানিয়া সোহাগরা। এসএসসিতে আনন্দ আর বিপাশার জিপিএ পাঁচ পাওয়া নিয়ে সে কি টান টান উত্তেজনা। দুজনের ব্যাপারেই আমরা নিশ্চিত ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আনন্দ একাই পেল পাঁচ। বিপাশার কান্না চোখ পানিপূর্ণ করে তুললো উপস্থিত সবার। তখনও জিপিএ পাঁচের জন্য চতুর্থ বিষয়ের মার্ক যোগ করার সুবিধা হয়নি। সদাহাস্য সুদর্শন আনন্দ এখন রেলের বড় কর্মকর্তা। রেল নিয়ে সদা ব্যস্ত আনন্দ এখন ফেসবুক পাতার প্রিয়মুখ। জিপিএ পাঁচ না পাওয়ার দুঃখ ঘুচেছে বিপাশার। সে বুয়েট থেকে হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার। ইশতিয়াক খান নির্ঝর, পড়া মুখস্থ না করে নিজের মতো করে লেখাই ছিলো যার বৈশিষ্ট, সেই নির্ঝর ঢাকা মেডিকেল থেকে হয়েছে ডাক্তার। কিছুদিন হলো দেখি সাংবাদিক পিতার সাথে পাল্লা দিয়ে ফেসবুক পাতায় লিখছে ব্যতিক্রমী ছড়া। শিমুলী, শুনেছি, স্বামীর সাথে থাকে জার্মানী। সেখানে রেস্ট‍ুরেন্টের ব্যবসা আছে তার। উদ্যমী ছেলে উজান ঢাবি থেকে নৃবিজ্ঞানে অনার্স করে চলে গিয়েছিলো আমেরিকা মাস্টার্স করতে। ফিরে এসে ঢাকায় একটা বড় সড় জব করছে কোনো এক বেসরকারি সংস্থায়। উজান আর আনন্দ দুই বন্ধু আমার প্রথম বই প্রকাশের সময় যেভাবে দৌড়ছুট করেছে ভুলতে পারবো না কোনো দিন। সোহাগ, সেই যে মোটা সোটা সেহাগ, ব্যান্ড সঙ্গীতে মঞ্চ মাতায়, সে নাকি ওদের ক্লাসেরই প্রপেন কে বিয়ে করে থাকে ঢাকায়। বড় সড় চাকরি করে দুদকে।

মনে পড়ে দুই হাজার চারের ব্যাচের অকেগুলো মেধাবী মুখ। এদের মধ্যে মাহিদুল, রিশাত রূম্মান, ফয়সাল জাকি, ধীমান পাল,, গোলাম রব্বানী পলাশ, সুমিত্রা, সুষ্মিতা, তানিয়া, আসাদুল্লা আল গালিব, আশিকুল আরেফিনের কথা মনে আছে আজও। ক্লাসের খুব শান্ত ছেলে ফয়সাল জাকি হয়েছে ডেন্টিস্ট। সে শুধু দাঁত নয়, আমার গোটা পরিবারের খোঁজখবর নেয় প্রায় প্রতি দিন। সুস্মিতার খবর জানি না, তবে সুমিত্রা ডাক্তার হয়েছে শুনেছি। মেধাবী ছেলে গালিব নাকি বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চাকরি করছে পিডিবিতে। আর সেই ফর্সা সুন্দর ধীমান পালও বুয়েট থেকে হয়েছে সফ্ট ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। কোথায় যেন বড় একটা চাকরিও করছে।
এবার আসি মাহিদুল আর রিশাত রূম্মানের কথায়। গ্রাম থেকে এসেছিলো মাহিদুল। ভর্তি হয়েছিলো ক্লাস সেভেনে। রিশাতদের ক্লাসে। ভর্তি হয়েই ফার্স্ট হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলো রিশাত রূম্মানের সাথে। সেই বিরোধাত্মক দ্বন্দ্ব যে একদিন মিলনাত্মক দ্বন্দ্বে পরিণত হবে কে বুঝতে পেরেছিলো সেদিন। তারা এখন সুখী দম্পতি। মাহিদুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। রিশাত রূম্মান সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল থেকে পাশ করে এখন মিটফোর্ডেরই ডাক্তার। গতকাল সন্ধ্যায় ফোনে কথা হলো ওদের সাথে। ঢাবি’র ক্যাম্পাসে হাঁটছিলো ওরা। অচিরেই মাহিদুল যাবে ইংল্যান্ডে পিএচডি করতে।

মাহিদুলকে ঠাট্টা করে বললাম, স্কুল জীবনে অনেক চেষ্টা করেও তো রিসাত রূম্মানকে ডিঙিয়ে ফার্স্ট হতে পারোনি, তা নিয়ে দুঃখ হয় না তোমার? সে সময়ের লাজুক ছেলে মাহিদুল ঝটপট উত্তর দেয়, দুঃখ তো হয়ই স্যার, তবে শোধ নিয়েছি কলেজে উঠে। ওকে আর ফার্স্ট হতে দেইনি। অ্যানুয়াল, টেস্ট, দুটোতেই আমিই ফার্স্ট। সেটা তো স্যার, আপনি নিজেই জানেন। ওর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কৃত্রিম ক্ষোভের সাথে রিশাত রূম্মান বললো, স্যার, ওর কথা মোটেও ঠিক নয়। আমি ইচ্ছা করে ছেড়ে দিয়েছি জায়গাটা। আসলে স্যার, ভালোবাসা আমাকে পরাজিত করেছে। না হলে ওর সাধ্য আমাকে ডিঙায়?

ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর এই তরুণ দম্পতির মধুর খুনসুটি দেখে ঢাবি’র আকাশে সপ্তমীর চাঁদও বুঝি মিটি মিটি হাসছে।

আমার শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অংশটা পার করেছি এখানে। এখানে আমার মূল আকর্ষণ ছিলো অসাধারণ কিছু মেধাবী মুখ। এদের অনেকের কথা আমি আগের পর্বে বলেছি। বাকীদের কথা বলবো আজ।

দুই হজার পাঁচের ব্যাচের মেধাবী ছেলে নির্যাস। শান্তশিষ্ট নির্যাস এখন কোথায় আছে কেমন আছে জানি না। শুনেছিলামখন বুয়েট থেকে বেরিয়ে ভালো চাকরি করছিলো দেশে। এখন নাকি পারমানেন্ট রেসিডেন্টশিপ নিয়ে থাকে কানাডায়। দুই হাজার ছয়ের সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া নোভার সাথে হঠাৎ একদিন দেখা বইমেলায়। আমাকে পেয়ে কী যে খুশি হয়েছিলো মেয়েটা। আমি মেলায় যতক্ষণ ছিলাম ততক্ষণই সে আমার বইয়ের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ঘুরেছে আমার পিছু পিছু।

দুই হাজার সাতের রেজোয়ানুর রহমান রিশাদের কথা খুব মনে পড়ে। রিশাদ পড়েছে বুয়েটে। শুনেছি এখন সে উচ্চ শিক্ষার জন্য আছে কানাডায়। মেধা আর সৌজন্য মিলে এক অপরূপ মহিমা দান করেছে ছেলেটাকে। প্লাবন ছিলো সম্ভবত সেকেন্ড বয়। মেধাবী এই ছেলেটা শুনেছি তেজগাঁ’র বুয়েটেক্স থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে একটা বড় সড় প্রাইভেট জব করছে। আরও অনেকের কথা মনে পড়ে। শুভ ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে শিক্ষক হয়েছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের। সুষমাও নাকি রুয়েট থেকে পাশ করে শুভ’র মতোই হয়েছে তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। রতন-অভি দুজনই শুনেছি বুয়েট থেকে পাশ করে বড় চাকরি করছে। তাসনিম, পেলব, সায়ন্তনী এদের কথাও মনে পড়ে খুব।

খুব মনে পড়ে এসএসসি’র দুই হাজার আটের ব্যাচের মোসাব্বিরের কথা। অতিরিক্ত প্রতিভার অধিকারী ছিলো ছেলেটা। ক্লাসে ওর মুখে হাঁক দেয়া ছিলো কঠিন কাজ। স্পষ্ট কথা বলতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করতো না। সে যেই হোক। কিন্তু এসএসসি’র বৃত্তির রেজাল্টে ওকেও ডিঙিয়ে মেহেদী হলো রাজশাহী বোর্ডে ফার্স্ট। মেহেদীর খোঁজ জানি না, শুনেছি মোসাব্বির সলিমুল্লাহ্ থেকে পাশ করে এখন সরকারি ডাক্তার। যদ্দুর জানি ওদের ব্যাচের সৌরভ সাহা বুয়েট থেকে পাশ করে এখন চাকরি করে বিটিসিএলএ। ছন্দা আর লানিয়া দুই মেধাবী মেয়ে হয়েছে ডাক্তার। ওদের সাথের সিফাতও ছিলো বেশ মেধাবী। কিন্তু সে যে কোথায়, কী করে, জানতে পারিনি। দুই রাজনৈতিক পরিবারের দুই মেধাবী মেয়ে লানিয়া আর সিফাতকে শিক্ষকরা মশকরা করে বলতো হাসিনা-খালেদা।

মনে পড়ে দুই হাজার দশের ফিরোজ আর মাজেদের কথা। এখানে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়েছে ওরা। চেষ্টা, উদ্যম আর একাগ্রতা থাকলে যে সব কিছুই সম্ভব এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্টে প্রমাণ করেছে ওরা। এদর সময়েই একাশি জন শিক্ষার্থীর মধ্যে এ-প্লাস পেয়েছিলো সাতষট্টি জন। তার মধ্যে যদ্দুর জানি নীলাভ হয়েছে ডাক্তার, স্মরণ বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার, সানিন আর্মির ক্যাপ্টেন আর সঞ্চিতা পড়তো ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, এর বেশি কিছু জানি না।

এই লেখায় যাদের নাম উল্লেখ করেছি তারাই সব নয়। এর বাইরে থেকে গেছে শত শত স্বপ্নময় মুখ। যাদের অনেকের সাথে দেখা হয়, কথা হয় ফেসবুকে। ছবি আর এসএমএস-এ। কারো কর্মক্ষেত্র, কারো পরিবারের আনন্দ-উৎসব, কারো ভ্রমণ-কথা, কারো বা একান্ত ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনার কথা বুকে নিয়ে প্রতিনিয়ত সামনে এসে দাঁড়ায় ফেসবুকের পাতা।

অনেকে লেখে, স্যার, আপনার ক্লাস খুব মিস করি। সেই যে প্রথম দিন ক্লাসের শুরুতে আমাদের সতর্ক করে একটা কবিতা বলেছিলেন, দিন ফুরায়ে যায় রে আমার দিন ফুরায়ে যায়, আজও মুখস্থ আছে, ভুলিনি। কেউ লেখে, স্যার, আপনার শাসন-বারণে এক সময় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম, এখন বুঝি জীবনের জন্য সেটা কতোটা প্রয়োজনীয় ছিলো। কেউ একজন লিখেছিলো, স্যার, আপনার উপর রাগ করে একদিন চলে এসেছিলাম। তারপর দিনরাত পড়াশুনা করে ভালো রেজাল্ট করে আপনাকে দেখাতে চেয়েছিলাম আমিও পারি। পরে মনে হলো আমার এই সাকসেসও তো স্যারের কারণেই। এটাও তো তারই কৃতিত্ব। সেদিন যদি আপনি আমাকে ওইভাবে তিরস্কার না করতেন তবে তো আমি আগের মতোই থেকে যেতাম।

কেউ কেউ লেখে, স্যার, এখনও কি প্রতি দিন অ্যাসেম্বিলিতে জাতীয় সঙ্গীত আর শপথ পাঠের পর দিবসের তাৎপর্য বলেন? এখনও কি একটুখানি সময় পেলে স্বাস্থ্যকথা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান? কতোদিন এসব শুনি না। খুব, খুব মনে পড়ে স্যার। অনেকে আবার ঠাট্টা-মস্করাও করে। লেখে, স্যার আপনি আমার বাবার শিক্ষক ছিলেন, আমি আপনার কাছে পড়েছি, আমি চাই আমার সন্তানও আপনার কাছে পড়‍ুক। তদ্দিন থাকবেন তো স্যার?

অনেকে সিরিয়াসলি লেখে, স্যার, আপনি আমার আদর্শ। দোয়া করবেন যেন আপনার মতো হতে পারি। মিস ইউ অ্যা লট স্যার, ভালো থাকবেন।

এসব পড়ে দুই চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। মনে মনে বলি, যেখানেই থাকো, ভালো থেকো বাছারা। আমিও তোমাদের অনেক অনেক মিস করি।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)