ভাঙন — অঝোর শাওন

Tista Tista

Express

প্রকাশিত: ১২:৪২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২০

★এক

“আব্বা, গাঙের পানি বাড়তাছে। লগিডা যেদিন ডুববো , আমাগো বাড়িও ওইদিন ডুববো। আব্বা একডা বড় লগি গারবার পারেন না, যেডা কোনোদিন ডুববোনা? ”

রবিউল পানিতে টিল ছোঁড়ে | কাল অব্দি খুঁটির তিনহাত পর্যন্ত পানি ছিলো | আজ সাত হাত। প্রতি রাতে তিন থেকে চারহাত করে পানি বাড়ে । এভাবে বাড়তে থাকলে দু- একদিনে ঘর তলিয়ে যাবে । রবিউল খুঁটিটায় টিল লাগাতে চায়, পারেনা । বাতাসের কারণে কিছুটা বেঁকে গিয়ে গানিতে পরে । কয়েক মূহুর্তে ইটের টুকরো পানিতে ডুবে যায় । তাহলে কি ইটের টুকরোর মতোই রবিউলদের বাড়িও পানিতে তলিয়ে যাবে? রবিউল মনে মনে ভাবে ।

ছোট মনে এতো বড় ভাবনার শেষ খুঁজে পায়না বলে ভাবনার কিনারা করতে পারেনা । রবিউলের ভাবনা সে সুন্দর একটা বাড়ি বানাবে । সুন্দর সদর দরজা থাকবে । নদীর পাশে ছোট্ট একটা দু’চালা ঘর ওর ঘরের জানালাটা হবে নদীর পাশে । দিনে রাতে সমান বাতাস লাগবে ঘরে। নদীর ঢেউ দেখা যাবে ।
জোয়ার ভাটা সব দেখা যাবে । চাঁদের আলো এসে জানালায় পরবে । নদীর পানি সে আলোয় ঝিলিক দেবে ।

রবিউল মন ভোরে সে দৃশ্য অনুভব করবে । তখন ওদের গ্রামটা দেখা যাবে শিল্পীর আঁকা ছবির মতো । ঠিক ওর বাংলা বইয়ের গ্রামের দৃশ্য যেমন, তেমন । রবিউল এই নদীর পাশেই ঘর বানাবে । মাটি দিয়ে খুব উঁচুতে | নদীর পানিতে সে ঘর ডুববেনা | ওর পোষা পাখিটাকে বারান্দায় না রেখে রাখবে জানালার কাছে। পাখিটা ডানা ঝাপটে কিচির মিচির করে ওকে গান শোনাবে ।

রবিউল দীর্ঘশ্বাস ফেলে । আরেকটা টিল হাতে তোলে । এবার নিশানা ঠিক করে নেয়। নিশানায় তাক করে ঠিক খুঁটিতে লাগায়।
“আব্বা । আমাগো ঘর ভাইঙা পানিতে ভাইসা গেলে আমরা থাকুম কই ?” রহমত আলী উত্তর দেয়না । উত্তর জানা থাকলে হয়তো বলা যেত । এমন প্রশ্নের উত্তর নেই বলে বলারও উপায় নেই।

★ দুই….
মসজিদে আযান হচ্ছে । মোল্লা সাহেব নিয়ম করে পাঁচবার আযান দেন | আযান শেষ হলে মোল্লা সাহেব মসজিদের বড় খোলা জানালায় এসে দাঁড়ান । দূর সীমানা পর্যন্ত নদীর স্রোত দেখা যায় । এই বয়সেও চোখের দ্রুতি বেশ পরিষ্কার । সকাল বিকেল দু’বেলা কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করলে চোখের দৃষ্টি আল্লাহর রহমতে ভালো থাকে – এ কথা মোল্লা সাহেব প্রচার করেন। গ্রামের বাচ্চা কাচ্চারা দৌড়ে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে যায় । মোল্লা সাহেব হাত দিয়ে ইশারা করে ওদের কাছে ডাকেন । খুব ধির গলায় কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বাচ্চাদের ডেকে বলেন, “ তোমরা নামায পড়ো?”

বাচ্চাদের কেউ কেউ জোড় গলায় একসাথে লম্বা সূরে ‘ হ্যাঁ’ বলে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাথা নাঁড়ায়। ওরা শব্দ করে না’ বলেনা । শুধু মাথা নাঁড়ায় । কয়েকজন আবার একজনের পিছে একজন দাঁড়িয়ে মুখ লুকিয়ে মুখে হাত চেপে হাসে । মোল্লা সাহেব দশ টাকার বাদাম কিনে দুটো করে করে বাচ্চাদের হাতে দেন। ওরা বাদাম পেয়ে খুশি হয় । মোল্লা সাহেব হাত উঠিয়ে বলেন,“ আসরের আযান হইলে সবাই মসজিদে এসো | আসলে আরো অনেক কিছু কিনে দিবো । ”

ছোট ছোট বাচ্চাগুলো একে অপরের দিকে তাকায় । প্রত্যেকে একদৌড়ে হাসতে হাসতে যার যার মতো করে চলে যায় । ফিরে তাকায় না। মোল্লা সাহেব মুচকি হাসেন। আরো দশ টাকার বাদাম কিনে পকেটে রাখেন। ওরা আসবে মোল্লা সাহেব জানেন। একে অপরের মুখ চেয়ে দেখবে। অথচ বাদাম খেতে চাইছে বলবেনা।

মোল্লা সাহেব আসরের আযান দেন । বাচ্চাগুলো দৌড়ে এসে মসজিদের সামনে গাদাগাদি করে দাঁড়ায় । একজনের পেছনে আরেকজন । লাইন ধরে । স্কুলে ওদেরকে এভাবে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন আনোয়ারা আপা । আনোয়ারা আপা আরো শিখিয়েছেন, বড়দেরকে দেখলে সালাম দিতে হয় । ওরা অবশ্য প্রায়ই এই কথা ভুলে যায়।

মোল্লা সাহেব আযান শেষে ওদের সবাইকে বাদাম দেয় । দু’টো করে । মসজিদের নদীর পাশটার বড় খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে নিরশ চোখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন দূরের স্রোতে । জামাতের সময় হবার আগ অব্দি চেয়ে থাকেন। জামাতের সময় হলে জোড়ে করে বলেন, আল্লাহ মালিক। তিনি যা করেন ভালোর জন্যই করেন………#চলবে…….