“সন্ধ্যা মালতী”— অঝোর শাওন

Tista Tista

Express

প্রকাশিত: ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২০

এক….

হালকা শীতে প্রতিবছর এই জায়গায় বারবার ছুটে যেতে হয় সন্ধ্যাকে। সার্কিট হাউজের বিশাল মাঠে একমাসের জন্য বসা বিশাল বইমেলার প্রতি ছোট থেকেই আকর্ষণ রয়েছে তার। তবু এবারের বইমেলাটি তার কাছে আরও আনন্দে মাখা। এবারের বইমেলায় সন্ধ্যার প্রথম কবিতার বই- “কে তুমি কে আমি”, প্রকাশিত হয়েছে। দারুণরকম সাড়া ফেলেছে তার বইটা। বুকস্টলে তাকেও থাকতে হচ্ছে পাবলিশারের সাথে সাথে।

এত আনন্দ আর সফলতা শেষেও সন্ধ্যার মনে একটা কথা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মনে দুঃখ একটাই, সেটা হল সবাই তার কবিতার কদর করলেও, যার জন্য তার এতগুলো কবিতা লেখা, যাকে ঘিরে তার কবিতারা এত সফলতা অর্জন করেছে, সেই মানুষটাই তার কদর বোঝেনি। বলাবাহুল্য, সে আর কেও নয়, সন্ধ্যার প্রাক্তন, স্পন্দন ।

স্পন্দন তার কবিতাগুলোকে কোনোদিনই তেমন প্রাধান্য দেয়নি। মনে মনে হয়তো ভালো বললেও, সবসময় সন্ধ্যাকে মুখের সামনে ছোটো করতে চেয়েছে। কিসের রাগ, সন্ধ্যা কোনোদিনই বুঝে উঠতে পারেনি। বোঝাপড়া হয়নি, সম্পর্কও টেকেনি। সন্ধ্যার মনে এসব কথাই এলোমেলো ভাবে এসে পড়ছিল আর সে বারবার আনমনা হয়ে যাচ্ছিল।

দুই….

হঠাৎ এক কিশোরী সন্ধ্যার একটা কবিতার বই হাতে তুলে নিয়ে সন্ধ্যার কাছে এসে বলে বই এর প্রথম পাতায় একটা অটোগ্রাফ দিয়ে দিতে। সন্ধ্যার প্রথম প্রথম হাসি লাগে এসব দেখে, কিন্তু কিশোরীকে সে নিরাশ করেনি। তার প্রচলিত ছদ্মনাম, যে নামে সে কবিতা লেখে, সেই নামটাই লিখে দেয় বই-এর প্রথম পাতায়। সাথে ওই কিশোরীর নাম আর এক বাক্যের শুভেচ্ছাবার্তাও দিয়ে দেয় সে।

কিশোরীটি খুশি হয়ে চলে যায়, কিন্তু মিনিট দুয়েকের মধ্যেই আবার ফিরে আসে আর একটা প্রশ্ন করে সন্ধ্যাকে। সে সন্ধ্যার কাছে জানতে চায় যে সে কেন তার ছদ্মনামে কবিতা লেখে, তার নিজের নাম কেন সে গোপন করে। আসলে একবার সফলতা চলে এলে, ছদ্মনামের আঁড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল নামটাও প্রত্যেক লেখকের ক্ষেত্রেই সবাই জানতে পেরে যায় সহজেই।

সন্ধ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে প্রশ্নটা শুনে। তার মনে পড়ে স্পন্দনের কথা। স্পন্দন সবসময় তাকে ভালোবেসে “সন্ধা মালতী” বলে ডাকতো। সন্ধ্যার লেখালেখি জীবনের শুরুর দিকে স্পন্দন তাকে বলেছিল যে “সন্ধ্যা” নামটা নাকি তাকে ঠিক মানায় না, তার নাকি সন্ধ্যা মালতী নামটাই বেশি পছন্দের। তারপর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও “সন্ধ্যা মালতী” নামেই সন্ধ্যার লেখালেখি শুরু হয়।

তিন….

কিশোরী মেয়েটি আবার সন্ধ্যাকে একই প্রশ্ন করে, সন্ধ্যার ভাবনায় এবার ছেদ পড়ে। সে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলে- “ওই নামটা আমাকে একজন দিয়েছিলো তাই। তোমরা আমার এই নামটাই মনে রেখো।” এটুকু বলেই সন্ধ্যা আবার ভিঁড়ের মাঝে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কিশোরী মেয়েটি মুচকি হেসে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে।

কিছুদূরে এগিয়ে গিয়ে, একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা তার বাবা স্পন্দনের হাতে বইটা দিয়ে দেয় সেই কিশোরী , তারপর একে অপরের হাত ধরে বইমেলা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যায় তারা।

সূর্য ডুবে যায়, সন্ধা গড়িয়ে রাত্রি নামে আর মাঠের মাঝের অনুষ্ঠানে গম গম শব্দে শোনা যায় – “ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে, আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে।”

©— অঝোর শাওন, ২৭ আগষ্ট, ২০২০, বিকেল ৩ টা, ঢাকা।